
ইন্দোনেশিয়া-আফ্রিকা সামিট ২০২৪
[ বাহাউদ্দিন ফয়যী ]
সবুজ অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে উন্নত সমরাস্ত্র তৈরি—সব ক্ষেত্রেই এখন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা বাড়ছে। ফলে এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ব্যবস্থা কিংবা অত্যাধুনিক সামরিক ইলেকট্রনিকস—আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশেষায়িত খনিজ ও উপাদানের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ জরুরি।
অথচ কয়েক দশক ধরে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা মৌলের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় আধিপত্য ধরে রেখেছে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো। এতে সম্পদে সমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলো একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার ঝুঁকিতে রয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
এই বাস্তবতা বদলাতে চাইছে ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ। প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ ও রপ্তানির প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তারা এখন নিজেদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে এবং সেগুলোকে ঘিরে দেশীয় শিল্প গড়ে তুলতে আগ্রহী। সরকারের এই নীতিকে বলা হয় ‘সম্পদ জাতীয়তাবাদ’—অর্থাৎ দেশের ভূখণ্ডে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, উত্তোলন ও বাণিজ্যের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। একই সঙ্গে এসব দেশ প্রতিরক্ষা শিল্পেও পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে চাইছে।
এ ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি ‘হিলিরিসাসি’ বা খনিজ সম্পদের দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। কাঁচা আকরিক, বিশেষ করে নিকেল রপ্তানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে জাকার্তা বিদেশি কোম্পানিগুলোকে দেশটির ভেতরেই আকরিক গলানো, পরিশোধন এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে উৎসাহিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ্য কেবল খনিজ উত্তোলন ও রপ্তানিতে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প উৎপাদনের মাধ্যমে সৃষ্ট বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধারও অংশীদার হওয়া।
তবে বিশ্বের বৃহত্তম নিকেল উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প এখনো আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। সাঁজোয়া যান ও পরিবহন বিমান তৈরির ক্ষেত্রেও এই নির্ভরতা রয়েছে। অর্থাৎ, বিপুল খনিজ সম্পদ থাকা আর সেই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। এই নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার ইন্দোনেশীয় প্রচেষ্টা সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব দেশও দীর্ঘদিন ধরে কাঁচামাল রপ্তানি করলেও সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে অধিক মূল্য সংযোজনের সুযোগ সীমিত পেয়েছে। ফলে নিজেদের সম্পদকে ঘিরে দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন স্বার্থ তৈরি করেছে।
এই সহযোগিতা এখন আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনও পেয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘের ‘কান্ট্রি সাপোর্ট মেকানিজম অন ক্রিটিক্যাল এনার্জি ট্রানজিশন মিনারেলস’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছেন। জাতিসংঘের টাস্কফোর্সের পরিকল্পনায় গড়ে ওঠা এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কাঁচামাল রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করা।
এই উদ্যোগের আওতায় ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে আফ্রিকার পাঁচটি দেশ—গিনি, মাদাগাস্কার, নাইজেরিয়া, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে। দেশগুলো নিজেদের নীতিনির্ধারণী অভিজ্ঞতা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার কৌশল পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করছে। এর লক্ষ্য, শুধু খনিজ উত্তোলন ও রপ্তানি নয়, বরং পরিশোধন এবং উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতাও নিজেদের দেশে গড়ে তোলা।
তবে নিকেল থাকলেই প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাঁচামাল নিশ্চিত হয় না। সামরিক প্রযুক্তিতে আরও নানা ধরনের বিশেষায়িত খনিজের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে বিরল মৃত্তিকা মৌল ও নাইওবিয়াম উল্লেখযোগ্য। উন্নত অপটিক্যাল ব্যবস্থা এবং ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ ও অনুসরণে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপাদান তৈরিতে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি নির্ভরতা কমাতে ইন্দোনেশিয়াকে নিকেলের বাইরেও খনিজ সরবরাহের উৎস নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
এই লক্ষ্যেই আফ্রিকার খনিজ সম্পদের দিকে নজর দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটির নতুন রাষ্ট্রীয় খনি প্রতিষ্ঠান পিটি পেরুসাহান মিনেরাল ন্যাসিওনাল (পারমিনাস), যা জাতীয় বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম দানান্তারার অধীনে পরিচালিত হয়, গ্যাবনের মাবুমিনে অবস্থিত বহুধাতব খনিজ ভান্ডার নিয়ে কাজ করতে আবুধাবি-সমর্থিত নিউ এনার্জি মেটালসের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিটির আওতায় ওই খনিজ ভান্ডারের সম্ভাবনা যাচাই ও উন্নয়নের বিষয়টি মূল্যায়ন করা হবে।
এই উদ্যোগের তাৎপর্য শুধু আফ্রিকা থেকে খনিজ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে আফ্রিকায় খনিজ উত্তোলনকে ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব পরিশোধন ব্যবস্থা ও স্থায়ী চুম্বক উৎপাদনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, এক অঞ্চলে খনিজ উত্তোলন এবং অন্য অঞ্চলে তার প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প উৎপাদনের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা। এর ফলে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রভাবাধীন বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
খনিজ সম্পদকে ঘিরে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতেও ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। ২০২৫ সালে জাকার্তায় রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দুই নেতা ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে তাঁরা আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে যৌথভাবে সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে চান। এ লক্ষ্যে স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—তিন ক্ষেত্রেই প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির যৌথ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করতে একটি কারিগরি প্রতিনিধিদল পাঠানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। এর মাধ্যমে দুই দেশ বিদ্যমান চুক্তিকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে চুক্তি স্বাক্ষর বা সহযোগিতার ঘোষণা থেকেই যে বাস্তব শিল্পপ্রকল্প গড়ে উঠবে, তার নিশ্চয়তা নেই। গ্যাবনের মাবুমিনে প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। এ বিষয়ে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি এখনো আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। খনি নির্মাণের বিষয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে প্রকল্পটি এখনো সম্ভাবনা যাচাই ও সহযোগিতার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে; বাস্তবে খনি নির্মাণের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশ্নটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নিকেল পরিশোধনে অগ্রগতি অর্জন করলেও বিরল মৃত্তিকা মৌলের ক্ষেত্রে একই সাফল্য অর্জন করা ইন্দোনেশিয়ার জন্য অনেক বেশি জটিল। এসব মৌলকে অন্যান্য উপাদান থেকে আলাদা করা এবং প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধতায় পরিশোধন করার জন্য অত্যন্ত উন্নত রাসায়নিক প্রকৌশল ও বিশেষায়িত প্রযুক্তি দরকার। ইন্দোনেশিয়া এখনো সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে খনিজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেগুলোকে ব্যবহারযোগ্য শিল্প উপাদানে রূপান্তরের প্রযুক্তিও আয়ত্ত করতে হবে দেশটিকে।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রীয় খনি প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘের উদ্যোগ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইন্দোনেশিয়া ও তার আফ্রিকান অংশীদারেরা বৈশ্বিক সম্পদ বাণিজ্যের প্রচলিত কাঠামো বদলানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নয়; বরং সেই সম্পদকে কেন্দ্র করে নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, উচ্চমূল্যের উৎপাদন এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির সক্ষমতা গড়ে তোলা।
এই প্রচেষ্টা সফল হলে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশগুলো নিজেদের শিল্প ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আরও স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারবে। প্রধান বিশ্বশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় প্রভাবিত বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার এই সহযোগিতার মূল চালিকাশক্তি।
